ছবি: আপন দেশ
বিকেল পাঁচটা বাজলেই আবুল কালাম আজাদের পৃথিবীটা যেন অন্ধকার হয়ে আসে। দিনের আলো তখনও স্পষ্ট, স্কুলের মাঠে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি, ব্যস্ত সড়কে মানুষের চলাচল, সবকিছুই স্বাভাবিক। অথচ তার চোখে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে চারপাশ। কিছুক্ষণ পর মানুষ, রাস্তা কিংবা দোকানপাট কিছুই আর ভালোভাবে দেখতে পান না তিনি। তাই প্রতিদিন অন্ধকার নামার আগেই গুটিয়ে নিতে হয় ঝালমুড়ির ছোট্ট পসরা।
বয়স ৫০ বছর। প্রায় দুই দশক ধরে ঝালমুড়ি-চানাচুর বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছেন তিনি। কখনো বাগেরহাট সদর উপজেলার চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের গেটের সামনে, আবার কখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিংবা মানুষের জমায়েতে গিয়ে ১০ টাকার ঝালমুড়ি ও চানাচুর বিক্রি করেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ টাকার মতো বিক্রি হলেও লাভ থাকে সামান্য। সে আয় দিয়েই স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে চলে তার সংসার।
আবুল কালামের নিজের বলতে কোনো ঘর নেই। বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কুলিয়া দাইড় গ্রামের বাসিন্দা তিনি। গ্রামের মানুষের দেয়া একটি ঘরেই স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। স্ত্রী শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিনিও বর্তমানে চোখে কম দেখতে শুরু করেছেন। নিজের শারীরিক অসুস্থতা ও স্ত্রীর প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সংসারের হাল ধরে রেখেছেন আবুল কালাম।
আরও পড়ুন<<>>প্রতিবন্ধী জনির সংসার চলে দড়ি টেনেই
তবে অভাব-অনটনের চেয়েও বড় কষ্ট রয়েছে তার জীবনে। পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যায় তার বড় মেয়ে। মেয়ের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু পাঁচ বছরেও মেয়ের কোনো সন্ধান পাননি। শেষ পর্যন্ত তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, তার মেয়ে ভারতে থাকতে পারে। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি আজও তার শেষ হয়নি।
আবুল কালাম বলেন,মেয়ের খোঁজে অনেক জায়গায় গিয়েছি, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু এখনো মেয়ের কোনো খোঁজ পাইনি। আমাকে বলা হয়েছে, আমার মেয়ে ভারতে আছে। কিন্তু তাকে কীভাবে খুঁজে পাব, জানি না। আমি রাতে চোখে দেখতে পাই না। আমার স্ত্রীও প্রতিবন্ধী, এখন চোখে কম দেখে। আমার হার্টের বাল্ব নষ্ট হয়ে গেছে। বুকের চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য নেই। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত মুড়ি বিক্রি করি। এ টাকা দিয়েই আমাদের তিনজনের সংসার চলে।
তিনি বলেন,মানুষ সহযোগিতা করেন, তাই কোনোভাবে সংসার চলে। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু তাকাতো, তাহলে হয়তো বড় মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারতাম। ছোট মেয়েটাকে ভালোভাবে পড়াতে পারতাম। নিজের ও স্ত্রীর চিকিৎসাও করাতে পারতাম।
অভাবের এ সংসারেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে তার ছোট মেয়ে জোহরা খাতুন। চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত ছাত্রী জোহরা পড়াশোনায় মেধাবী। বাবার ঝালমুড়ির ছোট্ট দোকান, মায়ের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা পরিবারের আর্থিক সংকট কোনোটিই তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি।
প্রতিদিন বাবার ঝালমুড়ির দোকানের পাশ দিয়ে স্কুলে যায় জোহরা। বাবার পেশা নিয়ে তার কোনো সংকোচ নেই। বরং বাবার কষ্টকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবেই দেখে সে।
জোহরা খাতুন বলে, বাবা অনেক কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ চালান। তিনি অসুস্থ, রাতে চোখে দেখতে পান না। তারপরও আমার পড়াশোনা বন্ধ করেননি। আমি পড়াশোনা করে ভালো কিছু করতে চাই। বাবার কষ্ট যেন একদিন দূর করতে পারি এটাই আমার স্বপ্ন।
শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, আমরা প্রায়ই কাকার কাছ থেকে মুড়ি খাই। তিনি খুব অসহায়। জোহরা আমাদের সঙ্গে পড়ে এবং খুব মেধাবী। কিন্তু তার বাবার সামর্থ্য নেই মেয়েকে ভালোভাবে পড়ানোর। তিনি রাতে দেখতে পান না। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি তাদের পাশে দাঁড়ান এবং তার বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, তাহলে পরিবারটির কষ্ট অনেকটাই কমবে।
আরেক শিক্ষার্থী মুনিয়া বলেন, জোহরা খুব ভালো ছাত্রী। নিয়মিত ক্লাস করে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী। ওর বাবা মুড়ি বিক্রি করেন এটা নিয়ে জোহরার মধ্যে কোনো সংকোচ নেই। বরং সে বাবার কষ্ট বোঝে। আমরা চাই, ও যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।

চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক মুস্তাহিদুর রহমান মুক্ত বলেন,জোহরা আমাদের স্কুলের মেধাবী ও নিয়মিত ছাত্রী। তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের গেটের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রি করে। তিনি রাতে চোখে দেখতে পান না, স্ত্রীও শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং বড় মেয়ে পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ। এত কষ্টের মধ্যেও তিনি মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্কুলের পক্ষ থেকে জোহরাকে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগসহ যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হচ্ছে। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকার পাশে দাঁড়ালে পরিবারটির কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে এবং জোহরার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
প্রায় ২০ বছর ধরে চিরুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের গেটে ১০ টাকার ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালান আবুল কালাম। নিজের চোখ ও বুকের অসুস্থতা, প্রতিবন্ধী স্ত্রীর চিকিৎসা আর পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ বড় মেয়ের কষ্টের মধ্যেও ছোট মেয়ে জোহরার পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বিকেল পাঁচটার পর চোখে দেখেন না বলে অন্ধকার নামার আগেই দোকান গুটিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। তবুও মেয়েকে ঘিরে তার স্বপ্ন জোহরা লেখাপড়া করে একদিন পরিবারের কষ্ট দূর করবে। চোখে অন্ধকার নামলেও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নে আলো জ্বলে আবুল কালামের।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































