ছবি : সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই শক্তিশালী হচ্ছে, ততই সামনে আসছে এক ভয়ংকর প্রশ্ন। এই প্রযুক্তি কি একদিন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে?
নাকি এআই হবে মানবজাতির সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি? আশঙ্কা, সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছে ভবিষ্যৎ নিয়ে এই প্রশ্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যতই সম্ভাবনার কথা বলা হোক, এবার প্রযুক্তি খাতের কয়েকজনের মন্তব্যে সামনে এসেছে ভয়াবহ আশঙ্কা।
তাদের দাবি, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আগামী এক দশকের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবী থেকে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
সিএনএন এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যাতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের কাজকে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে চাকরি ছাড়ার ঘোষণা দেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মী জ্যাকব কক্সন। এরপর একই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মী ইভান হুবিঙ্গার বলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশেরও বেশি।
এমন মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
মেশিন বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নেট সোয়ারেসও মানবজাতির সম্ভাব্য বিলুপ্তির আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তার মতে, বিষয়টি এমন এক পরিণতির কথা বলছে, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ মারা যাবে এবং শেষ মানুষটি শেষবারের মতো নিঃশ্বাস নেবে। তার দাবি, এমন পরিণতিই হয়ত সবচেয়ে সম্ভাব্য হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-কম্পিউটারের একটি ব্যবস্থা, যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মাত্র এক দশকের মধ্যে কীভাবে পৃথিবীর প্রায় ৮৩০ কোটি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা সবাই অবশ্য এমন আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন। তাদের প্রশ্ন, মানবজাতির বিলুপ্তির মতো বড় একটি দাবির পেছনে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কোথায়? কীভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যাই বা কী?
আরও পড়ুন : জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ
মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনার উদাহরণ টেনে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন সমালোচকেরা। ইলন মাস্ক পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য জানিয়েছিলেন। কিন্তু এ পরিকল্পনা যাচাই করতে বেশ কিছু সরাসরি প্রশ্ন করা যায়-মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার মতো কার্যকর মহাকাশযান কি এখন প্রস্তুত? সেখানে মানুষকে নামানোর ব্যবস্থা আছে? মানুষের বসবাসের জন্য ঘাঁটি কি তৈরি হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নেতিবাচক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কার ক্ষেত্রেও একইভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক হেইডি খলাফ। তিনি আগে একটি শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন।
খলাফের মতে, বৈজ্ঞানিক দাবির এমন বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়, যাতে সেটিকে প্রমাণ কিংবা ভুল প্রমাণ করা সম্ভব হয়। তা না হলে এমন দাবি বৈজ্ঞানিক যুক্তির বদলে বিশ্বাসনির্ভর বক্তব্যে পরিণত হতে পারে।
ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আগামী এক দশকের মধ্যেই মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে-এমন আশঙ্কার পেছনে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও সম্ভাব্য ঘটনার ব্যাখ্যা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে কি না, যাতে মানবসভ্যতা ধ্বংসের মুখে পড়ে-এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। আশঙ্কার জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরি, স্বয়ংক্রিয় রোবটের বিস্তার এবং পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
গবেষক থমাস লারসেনের মতে, অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে প্রভাবিত করে প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরিতে সাহায্য করাতে পারে।
তবে জীববিজ্ঞানী এরিক শিং মনে করেন, একটি ভাইরাস তৈরি ও ছড়িয়ে দেয়া অত্যন্ত জটিল। শুধু নকশা তৈরি করলেই তা কার্যকর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক উপকরণ, পরিবেশ, তাপমাত্রা ও পরীক্ষাগারের ব্যবস্থা।
স্বয়ংক্রিয় রোবট নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছানো যায়নি, যেখানে রোবট নিজেদের প্রয়োজনীয় কারখানা ও অবকাঠামো তৈরি করে নিজেদেরই সংখ্যা বাড়াতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও বড় বাধা হলো এগুলোর কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
আশঙ্কাবাদী গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি নিজেকে মানুষের সাহায্য ছাড়াই ক্রমাগত উন্নত করতে পারে, তাহলে তার কর্মকৌশল মানুষের ধারণার বাইরে চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে সংশয়বাদী গবেষকেরা বলছেন, এমন আশঙ্কা নিয়ে নীতি ও আইন তৈরির ক্ষেত্রে অনুমানের বদলে বাস্তব প্রমাণ ও পরিমাপযোগ্য ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেয়া দরকার।
অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতার জন্য কতটা বড় হুমকি হতে পারে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মূল প্রশ্ন হলো-ভবিষ্যতে এর ক্ষমতা কতদূর বাড়বে এবং মানুষ সেই ক্ষমতার ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে।
আপন দেশ/এমটিআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































