ছবি: আপন দেশ
দেশের প্রায় ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ নারী ও মেয়ে অনলাইন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী একাধিক ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং ডিজিটালি রাইট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মহিলা পরিষদ কার্যালয়ে ‘অ্যাবিউজ বিয়ন্ড দ্য স্ক্রিন' শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। এছাড়া ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ চৌধুরীসহ গবেষণা সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণাপ্রতিবেদনে দেশের ৫টি জেলায় (বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেট) ৫২১ জন নারী ও কিশোরীর ওপর পরিচালিত জরিপ, ভুক্তভোগীদের সাথে গভীর সাক্ষাৎকার এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
অনলাইন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র ও বহুমুখী রূপ
গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবার বুলিং বা অনলাইন সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি চক্রাকারে আবর্তিত ও ক্রমবর্ধমান সংকট। জরিপে অংশ নেয়া নারীদের মধ্যে—
৫২.৭ শতাংশ নারী হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন।
৩৭.১ শতাংশ নারী অর্থনৈতিক অপব্যবহার বা আর্থিক প্রতারণার মুখোমুখি হয়েছেন।
২৪.৫ শতাংশ নারী যৌন ও ছবিভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণী এবং শিক্ষার্থীরা এই সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ডিপফেক তৈরি, ব্ল্যাকমেইল, ডক্সিং এবং সমন্বিত ট্রোলের মতো অপরাধগুলোর বড় অংশীদার সাবেক বা বর্তমান অন্তরঙ্গ সঙ্গীরা।
আরও পড়ুন<<>>প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি
প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধের শিকার নারীদের একটি বড় অংশ বিচার পাওয়ার আশায় থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যান না। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৪.৬ শতাংশ ভুক্তভোগী পুলিশের শরণাপন্ন হন। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, ডিজিটাল প্রমাণের অপ্রতুলতা এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রতি পুলিশের এক ধরণের উদাসীনতা বা ভিকটিম-ব্লেমিং (ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবণতা)। থানায় জিডি করতে গেলে অনেক সময় ডিজিটাল প্রমাণের প্রিন্ট কপি চাওয়া হয়, যা সাধারণ নারীদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও গোপনীয়তা ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন এবং জাতীয় হেল্পলাইনগুলোর (যেমন- ১০৯, ৯৯৯) কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং সমন্বয়হীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, ৫৬ শতাংশ ভুক্তভোগী বিচার প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ৫৬.৫ শতাংশ নারী বাধ্য হয়ে কেবল অপরাধীকে ‘ব্লক’ করার মতো সাধারণ আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকছেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায় এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা
গবেষণায় ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, টিকটক ও এনজিএল-এর মতো অ্যাপগুলোর অপব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ও ডেটা মুছে ফেলার সুবিধা অপরাধীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। পাশাপাশি, সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও ভিকটিম-ব্লেমিংয়ের সংস্কৃতি (৭১.৬ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন) নারীদের মুখ বুজে থাকতে বাধ্য করছে। সাইবার সহিংসতার কারণে প্রায় ২১ শতাংশ নারী এখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মারাত্মক আতঙ্ক ও ভয়ের মধ্যে থাকেন, যা তাদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সংকট উত্তরণে প্রধান সুপারিশসমূহ
প্রতিবেদনে এ বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করা হয়েছে: ১. আইন সংস্কার: সাইবার সুরক্ষা আইনে ডক্সিং, এআই ডিপফেক এবং সাইবার মব আক্রমণকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং অফলাইন অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কঠোর শাস্তির বিধান করা। ২. প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে ডিজিটাল ফরেক্সিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং জেলা পর্যায়ে ফরেক্সিক সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ করা।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও ট্রমা-ইনফর্মড প্রশিক্ষণ দেয়া। ৩. প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: ফেসবুক বা অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলায় সহজে ব্যবহারযোগ্য রিপোর্টিং টুল এবং জরুরি কন্টেন্ট রিমুভাল প্রটোকল চালু করতে বাধ্য করা। ৪. সামাজিক সচেতনতা: বিদ্যালয় পর্যায় থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার আইন সংক্রান্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং সমাজ থেকে ভিকটিম-ব্লেমিংয়ের সংস্কৃতি দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনই পারে সাইবার জগতে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সমতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
আপন দেশ/কেএম/জেডআই
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































