ছবি : সংগৃহীত
শনিবার ( ১৭ অক্টোবর) বিকেলে দয়াগঞ্জের ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় হঠাৎ মাদকবিরোধী অভিযান চালান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ওই অভিযানের একটি ভিডিও তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আপলোড করেন। এর শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। অবশেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন ইশরাক হোসেন।
তবে যে এলাকার ঘটনায় ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেও পরিবর্তন হয়নি সেই চিত্র। প্রতিমন্ত্রীর অভিযানের পরদিনই সে এলাকার চিত্র আগের মতোই। রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ওই এলাকার সরেজমিনে দেখা যায়, আগের দিনের অভিযানে কয়েকজন আটক হলেও মাদক কারবারে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। আগের মতোই অবাধে চলছে কেনাবেচা।
রাজধানীর দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পশ্চিম পাশের ঘুণ্টিঘর এলাকা। সেখানে কিশোর থেকে তরুণ, মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ এমনকী নারীও রয়েছেন যারা প্রত্যেই মাদক বিক্রেতা। কারও হাতে কাঠের ও প্লাস্টিকের বাক্স কিংবা প্যাকেট, কেউবা আবার ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পকেট থেকে কাগজের পুরিয়া বের করে ক্রেতার হাতে দিয়ে টাকা নিচ্ছেন অনায়াসে।
দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে কোনো গ্রামীণ হাট বসেছে। তবে সেখানে কোনো নিত্যপণ্য নয়, চলছে মাদকের জমজমাট কারবার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যেই চলে এ মাদক কেনাবেচা, যার মধ্যে গাঁজার আধিক্যই সবচেয়ে বেশি। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্রই দেখা মেলে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ মাদক ব্যবসা চলছে। তবে গত কয়েক মাসে এর মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টাই সেখানে গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক খুব সহজেই পাওয়া যায়। প্রতি পুরিয়া গাঁজা বিক্রি হয় ১২০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার মাদক বিক্রি করেন। তবে পাইকারদের বেচাকেনা লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
এক নারী মাদক বিক্রেতা জানান, পেটের দায়ে গাঁজা বিক্রি করি। গাঁজা বিক্রি বন্ধ হলে পেটে টান পড়বে। আমার নিজের সন্তানরাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
পাশ থেকে আরেক নারী বলেন, আমার স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে জীবন নষ্ট করেছে। এখন সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে আমিও এ ব্যবসায় নেমেছি।
মাদক ব্যবসার কারনে চরম বিপাকে পড়েছেন এলাকার সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ক্রেতা ভেবে মাদক ব্যবসায়ীরা হাঁকডাক দেয়। যা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে, বিশেষ করে নারী পথচারীদের।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মরত স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানান, আগেও এখানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হতো, কিন্তু ইদানিং তা মাত্রা ছাড়িয়েছে। অফিস যাতায়াতের সময় মাদক ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ডাকে চরম বিব্রত হতে হয়। বাধ্য হয়ে এখন আমরা এ পথ এড়িয়ে চলি।
এর আগে গত শনিবার ( ১৭ অক্টোবর) বিকেলে দয়াগঞ্জের ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় হঠাৎ মাদকবিরোধী অভিযান চালান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ওই অভিযানের একটি ভিডিও তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আপলোড করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে উচ্চস্বরে কিছু বলছেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তার পাশ থেকে একজনকে একেবারে গুলি করে দেব বলতে শোনা যায়। তাদের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন অনুসারী ছিলেন।
আরও পড়ুন<<>>প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন
পুলিশ নিষ্ক্রিয় দাবি করে স্থানীয় এমপি ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে অন্তত ৩০-৪০ বার বৈঠক করেও কোনো সুফল মেলেনি। জনবল ও গাড়িসংকটসহ নানা অজুহাত দেখায় পুলিশ। ইতোপূর্বে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গুলিতে পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সে কারণেই তিনি নিজের নিরাপত্তায় অস্ত্র সঙ্গে রেখেছিলেন। তবে কোনো গুলি বা কাউকে ভয় দেখাননি বরং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান খান জানান, ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচা রোধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। যখনই যাই, একসঙ্গে ২০-৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, জামিনে বা নানা উপায়ে বেরিয়ে তারা আবার একই কারবারে জড়িয়ে পড়েন। মূলত স্থানটিতে ভাসমান মানুষের আনাগোনা বেশি হওয়ায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তার সহযোগীদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে পুলিশ।

ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে এ ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্তে আইনি ব্যত্যয় বা কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের অভিযান নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। এ বিষয়ে অনেকেই ইশরাক হোসেনের বাড়াবাড়ি মনে করলেও বিরোধী রাজনীতিবিদদের আঙুল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। তাদের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণেই একজন প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র হাতে মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হয়েছে। তবে আলোচনা-সমালোচনার রেশ না কাটতেই রোববার রাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগের গুঞ্জন শোনা যায়। ওই বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয় বলে জানা যায়। তবে বিষয়টি গুঞ্জন বলে দাবি করেন ইশরাক হোসেন।
পরদিন সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ইশরাক বলেন, দল চায়নি, নিজে থেকেই পদত্যাগ করছি।
প্রধানমন্ত্রী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান ইশরাক হোসেন।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































