Apan Desh | আপন দেশ

বিশ্ব শিশু হাড়-জোড় দিবস আজ

সুস্থ শৈশব-মজবুত ভবিষ্যৎ: আমাদের করণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ০৯:৫৭, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১০:০৩, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সুস্থ শৈশব-মজবুত ভবিষ্যৎ: আমাদের করণীয়

ছবি : আপন দেশ

সুস্থ শৈশবই গড়ে তোলে একটি মজবুত ভবিষ্যৎ। আজকের শিশু আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার। একটি শিশুকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সুস্থভাবে বড় করে তুলতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। 

শিশুদের প্রাণোচ্ছল হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর খেলাধুলাই একটি সুস্থ সমাজের সবচেয়ে সুন্দর চিত্র। কিন্তু তাদের হাড়, জোড় ও পেশির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা কতটা সচেতন? আধুনিক যান্ত্রিক জীবনযাপন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। জন্মগত ত্রুটি, পুষ্টির ঘাটতি ও খেলাধুলাজনিত আঘাতও তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর পালিত হয় বিশ্ব শিশু হাড় ও জোড় দিবস। ১৯ অক্টোবর (সোমবার) সে দিবস।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস বোন অ্যান্ড জয়েন্ট ইনিশিয়েটিভের পেডিয়াট্রিক স্পেশাল্টি গ্রুপ ২০১২ সালের ১৯ অক্টোবর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করে। শিশুদের হাড় ও পেশি-কঙ্কালতন্ত্রের সুস্থতা, রোগ প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ১২ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত পালিত বোন অ্যান্ড জয়েন্ট অ্যাকশন উইকের অংশ হিসেবে দিবসটি শিশুদের হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতন হওয়ার আহবান জানায়।

শিশুদের হাড় প্রাপ্তবয়স্কদের হাড়ের মতো স্থির নয়; বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। হাড়ের প্রান্তে থাকা গ্রোথ প্লেট বা বৃদ্ধিফলক হাড়ের দৈর্ঘ্য বাড়াতে সাহায্য করে। সেখানে আঘাত লাগলে কখনো কখনো স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। শৈশব ও কৈশোরে পুষ্টি, ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হাড়ের সর্বোচ্চ ভর বা পিক বোন মাস অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর প্রভাব ভবিষ্যতের হাড়ের শক্তি ও ভঙ্গুরতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

শিশুদের হাড় ও জোড়ের সমস্যার মধ্যে ক্লাবফুট, ডেভেলপমেন্টাল ডিসপ্লাসিয়া অব দ্য হিপ, অস্টিওজেনেসিস ইমপারফেক্টা, স্কেলিটাল ডিসপ্লাসিয়া ও অ্যাকন্ড্রোপ্লাসিয়া উল্লেখযোগ্য। ক্লাবফুটে শিশুর পা ভেতরের দিকে বাঁকা থাকে; পনসেটি পদ্ধতি, কাস্টিং ও ব্রেসের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার ছাড়াই সংশোধন সম্ভব। ডিডিএইচ-তে নিতম্বের জোড়ের বিকাশ ব্যাহত হয়। অস্টিওজেনেসিস ইমপারফেক্টায় জিনগত কারণে হাড় ভঙ্গুর হয়, আর অ্যাকন্ড্রোপ্লাসিয়ায় হাড়ের বৃদ্ধির বিশেষ ধরন শরীরের গঠনে প্রভাব ফেলে।

আরও পড়ুন<<>>বিশ্ব মেনোপজ দিবস আজ

শিশুদেরও জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস হতে পারে। এতে জোড়ে ব্যথা, ফোলা ও শক্ত হয়ে যাওয়া দেখা দেয়। ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম বা ফসফরাসের ঘাটতি কিংবা বিপাকীয় সমস্যায় রিকেটস হতে পারে, যার ফলে হাড় নরম ও পা বাঁকা হয়ে যেতে পারে। ব্লাউন্ট ডিজিজে হাঁটুর কাছের হাড়ের বৃদ্ধির অস্বাভাবিকতায় পা ধনুকের মতো বাঁকা হয়। এ ছাড়া স্কোলিওসিস, হাড় ভাঙা এবং খেলাধুলাজনিত আঘাতও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

হাড় মজবুত রাখতে শিশুর খাদ্যতালিকায় দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থাকা দরকার। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাড় গঠনে এবং ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। ডিমের কুসুম ও তৈলাক্ত মাছ ভিটামিন ডির উৎস। সূর্যালোকের প্রভাবেও শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়; সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টার মধ্যবর্তী সময়ের মৃদু রোদ ভিটামিন ডি সংশ্লেষে সবচেয়ে বেশি কার্যকর, তবে সবার জন্য নির্দিষ্ট ১০ বা ১৫ মিনিট রোদে থাকাই যথেষ্ট—এমন নিশ্চয়তা নেই। পুষ্টির ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে।

নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, লাফানো, সাইকেল চালানো এবং বয়সোপযোগী খেলাধুলা হাড় ও পেশির বিকাশে সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন বহনকারী ব্যায়াম শিশুদের হাড়ের খনিজ ঘনত্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিপরীতে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা শারীরিক সক্রিয়তা কমিয়ে দেয়। তাই পড়াশোনার মাঝে বিরতি, স্বাভাবিক অঙ্গবিন্যাস, উপযুক্ত স্কুলব্যাগ ও আরামদায়ক জুতা নিশ্চিত করা উচিত। গবেষকদের পরামর্শ-স্কুলব্যাগের ওজন শিশুর শরীরের মোট ওজনের ১০-১৫%-এর বেশি হওয়া উচিত নয়। খেলাধুলায় হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামও জরুরি।

শিশু হঠাৎ খুঁড়িয়ে হাঁটলে, পায়ে ভর দিতে না পারলে, জোড়ে তীব্র ব্যথা ও ফোলার সঙ্গে জ্বর হলে কিংবা অঙ্গের অস্বাভাবিক বিকৃতি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এসব লক্ষণ সেপটিক আর্থ্রাইটিসের মতো গুরুতর সংক্রমণ নির্দেশ করতে পারে। রাতে বারবার ব্যথায় ঘুম ভাঙা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা সামান্য আঘাতে বারবার হাড় ভেঙে যাওয়াও অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজনে শিশু অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।
চিকিৎসা গবেষণায় বোন মিনারেল ডেনসিটি, শিশুদের সংক্রমণ শনাক্তকরণ, জিনগত রোগ এবং স্থূলতার প্রভাব বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। 

চঈজ-ভিত্তিক পরীক্ষা কিছু সংক্রমণের জীবাণু শনাক্ত করতে সহায়তা করে, যদিও চিকিৎসা নির্ধারণে অন্যান্য পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে। অস্টিওজেনেসিস ইমপারফেক্টা ও অ্যাকন্ড্রোপ্লাসিয়ার জিনগত কারণ এবং স্টেম সেল থেরাপির সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা চলছে; তবে সব নতুন পদ্ধতি এখনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নয়।

বাংলাদেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, পুষ্টিসচেতনতা, নিরাপদ খেলাধুলা এবং সহজলভ্য শিশুস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিভাবকদের উচিত শিশুর বৃদ্ধি, হাঁটাচলা ও শারীরিক সক্ষমতার পরিবর্তনে নজর রাখা এবং সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে দেরি না করা। শিশুর শরীরের গঠন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য না করে তার আত্মবিশ্বাস ও সুস্থ বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, আজকের সুস্থ শৈশবই আগামী দিনের মজবুত ভবিষ্যৎ।

আপন দেশ/জেডআই

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়