ছবি : সংগৃহীত
সিঙ্গাপুরে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক বেতন না পেয়ে ও কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। যাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশি। হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়ায় আয়-রোজগার, থাকা-খাওয়া এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
বকেয়া বেতন ও কর্মসংস্থান হারানোর দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকা এসব শ্রমিকের দুর্ভোগের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম)।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’-এর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এতে বলা হয়েছে, গত দুই থেকে তিন মাস ধরে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের অনেকেই বেতন পাচ্ছেন না। এর মধ্যে কয়েকজনের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হয়েছে।
ঋণের বোঝা, দেশে পরিবারের খরচ : ২৪ বছর বয়সি বাংলাদেশি শ্রমিক হোসেন মৃদুল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সিঙ্গাপুরে আসেন। ওভারটাইমসহ মাসে ৬০০ সিঙ্গাপুরি ডলার আয় করতেন তিনি। আয়ের প্রায় পুরোটাই দেশে পাঠাতেন।
এর অর্ধেক খরচ হতো সিঙ্গাপুরে আসার জন্য নেওয়া ৯ হাজার ডলারের ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে। বাকি টাকা দিয়ে পাবনায় থাকা ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চলত।
কিন্তু গত দুই মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না মৃদুল। এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে তার ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হয়েছে। অথচ পারমিটটির মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত।
মৃদুল বলেন, আমার পরিবারের অবস্থা ভালো না বলেই আমি সিঙ্গাপুরে এসেছিলাম। এখন কাজও নেই, বেতনও নেই। পরিবার কীভাবে বাঁচবে, তা নিয়ে আমি খুব আতঙ্কে আছি।
একই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এর ২১ বছর বয়সি শ্রমিক আরেক বাংলাদেশি সায়মন ইসলাম। তার প্রায় ১ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুরি ডলার বেতন বকেয়া রয়েছে। তবে সেই টাকা পুরোপুরি ফেরত পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
শ্রমিকদের কয়েকজন জানান, সিঙ্গাপুরের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে থাকতে দালালদের ১২ হাজার ডলারেরও বেশি দিয়েছেন তারা। এই খাতের আওতায় জুরং আইল্যান্ডের মতো শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন কারখানা ও স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পান তারা।
শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এক বছর কাজ করার পর তাদের সিঙ্গাপুরের নির্মাণ খাতের প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন কোর্সে পাঠানো হবে। কিন্তু তাদের প্রায় কাউকেই সেই প্রশিক্ষণের সুযোগ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
শ্রমিকদের অনেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে নির্মাণ খাতে যেতে আগ্রহী। তাদের মতে, নির্মাণ খাতে আয় তুলনামূলক বেশি। গত অগাস্টে সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘ট্রানজিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু’-এর এক জরিপে দেখা যায়, প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে গড় মাসিক আয় ৭৭১ সিঙ্গাপুরি ডলার, নির্মাণ খাতে তা ৮৬৮ ডলার।
আরও পড়ুন <> দেশে ফিরলেন লিবিয়ায় থাকা ১৭২ বাংলাদেশি
তদন্ত ও শ্রমিকদের সহায়তায় কর্তৃপক্ষ : এ অবস্থায় শনিবার এক বিবৃতিতে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম) জানায়, ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’ এবং ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
বকেয়া বেতনের দাবিতে ‘ট্রাইপার্টাইট অ্যালায়েন্স ফর ডিসপিউট ম্যানেজমেন্টে’ (টিএডিএম) অভিযোগ করা শ্রমিকদের সহায়তা দিচ্ছে মন্ত্রণালয় ও অভিবাসী শ্রমিক কেন্দ্র (এমডব্লিউসি)।
‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’-এর ১৫ জন শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজন অক্টোবরে তাদের বকেয়া বেতন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। ২৫ বছর বয়সি বাংলাদেশি শ্রমিক রাজীব হোসেন জানান, আগের সপ্তাহে তিনি বকেয়া বেতন পেয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেই নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার অনুমতিপত্র দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশে দালালদের দেয়া অর্থ ফেরত পাওয়া কিংবা নির্মাণ খাতের সার্টিফিকেশন পাওয়ার বিষয়ে এমওএম সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারছে না বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে এমডব্লিউসি জানায়, অংশীদার সংস্থাগুলোর সহায়তায় তারা প্রায় ৯০ জন শ্রমিককে খাবার দিচ্ছে। পাশাপাশি তাদের অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।
বেতন না দিলে সিকিউরিটি বন্ড বাজেয়াপ্ত হতে পারে : দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রমে অনিয়ম ও ভুয়া কর্মী দেখিয়ে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সিঙ্গাপুরের আইন অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের নির্ধারিত সময়ে বেতন দিতে ব্যর্থ হলে নিয়োগকর্তার জমা দেয়া বাধ্যতামূলক সিকিউরিটি বন্ড বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম) জানিয়েছে, তদন্তে শ্রমআইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে তদন্তের পাশাপাশি বকেয়া বেতন আদায়, নতুন কর্মসংস্থান এবং দেশে পাঠানোর খরচ মেটাতে ঋণ নেওয়া শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
আপন দেশ/এমটিআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































