ফাইল ছবি
বাংলাদেশের উশুতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়া অন্যতম সম্ভাবনাময় সিনিয়র খেলোয়াড় নাজমুল হাসান। অথচ চীনে অনুষ্ঠেয় ‘তাওলু উশু অ্যাথলেটদের জন্য বাংলাদেশ প্রশিক্ষণ কোর্স’-এর ৩০ সদস্যের তালিকায় নেই তার নাম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদকজয়ী এ খেলোয়াড় কীভাবে ও কেন তালিকার বাইরে রয়ে গেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বাছাই ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে। একই সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের উশুর অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ উশু ফেডারেশনের দায়িত্ব পালন নিয়েও।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উশু দলের এ খেলোয়াড় সাম্প্রতিক জাতীয় আসরগুলোতে নিয়মিত স্বর্ণপদক জিতে আসছেন। ২০২৫ সালের জাতীয় উশু চ্যাম্পিয়নশিপেও স্বর্ণ জেতেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এশিয়ান ট্র্যাডিশনাল উশু প্রতিযোগিতায় দুটি ব্রোঞ্জ এবং ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক উশু ফেডারেশনের তাওলু ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতায় একটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্য পদক রয়েছে তার। আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের পদকের অন্যতম সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত নাজমুলের কাছ থেকে আগামী দক্ষিণ এশীয় গেমসেও ফল প্রত্যাশা করে ফেডারেশন।
ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদকের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ে দেয়া তাদের প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় নাজমুলের নাম ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ওই তালিকায় তার নাম ছিল নিচের দিকে। পরবর্তী সময়ে তালিকার ওপরের দিকে থাকা খেলোয়াড়দেরই মূলত বিবেচনায় নেয়া হয়। ফলে নাজমুলের নাম বাদ পড়ে থাকতে পারে।
পরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিকেএসপির মনোনয়নসহ ৩০ জনের একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করে ফেডারেশনকে পাঠায়। সে তালিকায় নাজমুলের নাম ছিল না। এ নিয়ে ফেডারেশন ২ আগস্ট লিখিত আপত্তি জানায়।
এরপর ৯ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের পাঠানো তালিকাটিই মূল্যায়ন করে ফেরত দেয় ফেডারেশন। ফেডারেশনের ব্যাখ্যা, এটি তাদের নতুন করে তৈরি করা তালিকা নয়; বরং মন্ত্রণালয়ের দেয়া ৩০ জনের তালিকার ওপর তাদের মূল্যায়ন। সে মূল্যায়নেও নাজমুলের যোগ্যতা ও সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তাকে তালিকায় যুক্ত করা হয়নি।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে—ফেডারেশন যদি নাজমুলকে দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন ও সম্ভাবনাময় তাওলু খেলোয়াড় মনে করে, তাহলে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো তালিকা মূল্যায়নের সময় তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হলো না কেন?
ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক নিজেই বলেন, নাজমুলের মতো এমন মানসম্পন্ন ও সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়কে এখানে না রাখাটা মানা যায় না। এশিয়ান গেমসে আমরা তার কাছ থেকে ফলাফল আশা করি। অথচ প্রাথমিক তালিকায় নাজমুলের নাম থাকার কথা বলার পরও শেষ পর্যন্ত তার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ফেডারেশনের ভূমিকা কতটা সক্রিয় ছিল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
তালিকা নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠেছিল বিকেএসপি থেকে তুলনামূলক বেশি সদস্য নেয়া, কয়েকজন জুনিয়র খেলোয়াড়কে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাওলুর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সান্দার দুই কোচের নাম থাকা নিয়ে।
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (স্পোর্টস-১) মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে যেভাবে তালিকা দেয়া হয়েছে, আমরা সেভাবেই বিবেচনা করে কাজ করেছি।
আরও পড়ুন<<>>অশ্রুসিক্ত চোখে বাবাকে শেষ বিদায় মেসির
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. নূর আলম জানান, ৩০ জনের মধ্যে দুজন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বাকি ২৮ জনের অর্ধেক ফেডারেশন ও অর্ধেক বিকেএসপি থেকে এসেছে। তালিকাটি চীনা দূতাবাসে পাঠানোর পর তাদের যাচাই-বাছাই অনুযায়ী চূড়ান্ত তালিকা ও সরকারি আদেশ দেয়া হবে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক মো. দৌলতুজ্জামান খান, এনডিসি বলেন, ফেডারেশন ও বিকেএসপি অর্ধেক করে তালিকা দিয়েছে। কারা কেন মনোনীত হয়েছেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষই ভালো বলতে পারবে।
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিকেএসপির এক সিনিয়র উশু কোচ জানান, এটি শুধু সিনিয়র খেলোয়াড়দের জন্য কোনো উচ্চতর কর্মক্ষমতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; বরং একটি মৌলিক সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্টদের বুনিয়াদি উন্নয়ন এবং পরবর্তী উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা হবে। বিকেএসপি থেকে বেশি সদস্য যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ফেডারেশনের তালিকাতেও বিকেএসপির অনেক খেলোয়াড়কে রাখা হয়েছিল। জুনিয়রদের বিষয়ে তার দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরে উশুর সঙ্গে যুক্ত এবং একেবারে অনভিজ্ঞ নয়।
তাওলুর প্রশিক্ষণে সান্দার দুই কোচ থাকার বিষয়ে ওই কোচ বলেন, কাগজে-কলমে তারা সান্দার কোচ হলেও বাস্তবে তাওলু ও সান্দা—দুই বিভাগেই কোচিং করান এবং দুই ক্ষেত্রেই তাদের প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এসব ব্যাখ্যায় তালিকা নিয়ে ওঠা অন্য প্রশ্নগুলোর অনেকটাই পরিষ্কার হলেও নাজমুলের বাদ পড়ার প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। ফেডারেশন নিজেই যদি তাকে দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন ও সম্ভাবনাময় তাওলু খেলোয়াড় মনে করে, তাহলে প্রাথমিক তালিকায় তার অবস্থান যেখানেই থাকুক, পরবর্তী মূল্যায়নে তাকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব কি ফেডারেশনের ছিল না?
প্রশ্নটি তাই শুধু মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের নয়। দেশের উশুর অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ উশু ফেডারেশন কি এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে? নাজমুলের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদকজয়ী একজন সিনিয়র খেলোয়াড় নিজেদের মূল্যায়নেও সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও তালিকায় না থাকলে বাছাই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
চূড়ান্ত তালিকা এখনো হয়নি। ফলে নাজমুলের অর্জন, অভিজ্ঞতা ও তাওলুতে তার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি পুনর্বিবেচনা করা হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































