Apan Desh | আপন দেশ

১৭ বছর ধরে নিজের চুল নিজেই কাটেন মুজাহিদ

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১২:৪৩, ২৪ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১২:৪৯, ২৪ আগস্ট ২০২৬

১৭ বছর ধরে নিজের চুল নিজেই কাটেন মুজাহিদ

ছবি: আপন দেশ

চুল বড় হয়েছে, অথচ নাপিতের দোকানে যাওয়ার তাড়া নেই। কাউকে ফোন করে সিরিয়াল নিতে হয় না, দোকানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে অপেক্ষাও করতে হয় না। আয়নার সামনে একটি কাঁচি আর চিরুনি নিয়ে বসলেই কাজ শেষ। প্রায় ১৭ বছর ধরে এভাবেই নিজের চুল ও দাড়ি নিজেই কাটছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর মুজাহিদুল ইসলাম।

তখন তিনি মাদরাসার ছাত্র। সপ্তাহের ছয় দিন পড়াশোনা ও মাদরাসার নিয়মকানুনের মধ্যে কাটত। শুক্রবার ছিল ছুটির দিন। সে একদিনে বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানো, নানা কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও চুল কাটাতে গিয়ে দিনের বড় একটা সময় চলে যেত নাপিতের দোকানে। কারণ, তার পছন্দের নরসুন্দরের দোকানে সবসময় ভিড় থাকত। আগে আসা মানুষের সিরিয়াল শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে হতো। কখনো সে অপেক্ষা গড়াত ঘণ্টার পর ঘণ্টায়। বারবার একই ঝামেলায় বিরক্ত হয়ে একদিন মুজাহিদুল ঠিক করেন, আর নাপিতের দোকানে নয়, নিজের চুল নিজেই কাটবেন।

সময়টা ২০০৬ সালের দিকে। বাজার থেকে কিনে আনেন একটি কাঁচি ও চিরুনি। এরপর বাড়িতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুরু হয় নতুন এক কাজ শেখার চেষ্টা। প্রথমদিকে নিজের চুল কাটতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাকে। আয়নায় এক পাশ দেখে অন্য পাশ ঠিকভাবে কাটা, কোথায় কতটা চুল রাখতে হবে, কিছুই সহজ ছিল না। 

নিজের চুলে বারবার চেষ্টা করার পাশাপাশি একসময় মাদরাসার এক ছোট ভাইয়ের চুল কাটার সাহস করেন। কিন্তু সে পরীক্ষার ফল সুখকর হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে ওই ছাত্রের মাথা ন্যাড়া করে দিতে হয়েছিল।

সে ব্যর্থতাই অবশ্য মুজাহিদুলকে দমাতে পারেনি। বরং এরপর নিয়মিত সহপাঠী ও ছোটদের চুল কাটতে শুরু করেন। কাটতে কাটতে কাঁচি ধরার কৌশল, চুলের ধরন বুঝে কাটার পদ্ধতি এবং মাপ ঠিক রাখার অভ্যাস তৈরি হয়। এরপর নিজের চুল কাটার কাজটিও অনেকটা সহজ হয়ে আসে।

আরও পড়ুন<<>>বগুড়ায় সাবেক ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা

মুজাহিদুল বলেন, অন্যের চুল যখন কেটে দিতে পারছেন, তখন নিজের চুল কাটার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন কী? এ ভাবনা থেকেই নিজের চুল কাটার অনুশীলন আরও বাড়িয়ে দেন। একসময় বিষয়টি তার কাছে আর কঠিন কিছু মনে হয়নি। 

সে থেকে কেটে গেছে প্রায় ১৭ বছর। মাদরাসার ছাত্র থেকে এখন তিনি শিক্ষক। বর্তমানে পার্বতীপুর উপজেলার ভবানীপুর ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। কিন্তু এত বছরেও বদলায়নি সে পুরোনো অভ্যাস। চুল একটু বড় হলেই আয়না সামনে নিয়ে বসেন মুজাহিদুল। কাঁচি ও চিরুনি হাতে নিয়ে নিজের মতো করে চুলের আকৃতি ঠিক করেন। একইভাবে দাড়িও নিজেই কাটেন।

শুধু নিজের চুল কাটাতেই তার দক্ষতা সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামের অনেকের চুলও তিনি কেটে দিয়েছেন। মানিক, রেজা, রাতুল, ফরহাদ, সঞ্জিত, সোহাগ ও জয় বলেন, ছুটিতে বাড়িতে এলে মুজাহিদুল ভাই তাঁদের চুল কেটে দিতেন। সেলুনের মতো চেয়ারে বসিয়ে বেশ যত্ন করেই চুল কাটতেন তিনি।

মুজাহিদুলের ছোট ভাই ও গণমাধ্যমকর্মী মোকাররম হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার ভাই নতুন কিছু শেখার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। মাদরাসা থেকে ছুটিতে বাড়ি এলেই ছোটদের চুল কেটে দিতেন। পরে একসময় নিজের চুলও নিজেই কাটা শুরু করেন। প্রথম দিকে বিষয়টি পরিবারের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও এখন এটি তার স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে গেছে।

মুজাহিদুলের গল্পের শুরুটা ছিল নাপিতের দোকানের কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা থেকে। সে বিরক্তিই তাকে হাতে তুলে দিয়েছিল কাঁচি-চিরুনি। ১৭ বছর পর সেই কাঁচি-চিরুনিই হয়ে উঠেছে তার নিজের চুল কাটার সঙ্গী। অন্যরা যেখানে চুল কাটাতে সেলুন খোঁজেন, মুজাহিদুল সেখানে আয়নার সামনে বসেই নিজের কাজ নিজে সেরে নেন। 

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়