Apan Desh | আপন দেশ

বাগেরহাটে সাংবাদিক-সাবেক সামরিক কর্মকর্তার ওপর হামলা 

বাগেরহাট প্রতিনিধি, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১৭:২৮, ১৮ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৮:২৬, ১৮ জুন ২০২৬

বাগেরহাটে সাংবাদিক-সাবেক সামরিক কর্মকর্তার ওপর হামলা 

ছবি: আপন দেশ

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার মল্লিকের বেড় ইউনিয়নে সন্নাসী বাজারে সাংবাদিক ও সাবেক সামরিক বাহিনী কর্মকর্তার ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় হামলা হয়েছে। হামলায় স্থানীয় এক সাংবাদিক, নৌবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কমান্ডারসহ অন্তত তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা যায়, মল্লিকের বেড় ইউনিয়নে সন্নাসী বাজারে সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার তন্নি তার বাবার পৈত্তিক বাড়িতে স্থানীয় কয়েকজনকে ভাড়ার বিনিময়ে থাকতেন। তারা দীর্ঘদিন যাবৎ ভাড়াটিয়া হিসেবে থেকে স্থানীয়  চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এ ঘটনা জানার পর ফারজানা আক্তার তার পৈতৃক বাড়ি থেকে ভাড়াটিয়াদের নামিয়ে দিতে চাইলেই বাঁধে বিপত্তি। এছাড়াও তিনি ঐ বাড়িতে একটি আধুনিক ও উন্নতমানের হাসপাতাল তৈরি করার ঘোষণা দেন। তখন থেকেই সন্ত্রাসী জাহিদুল বিভিন্নভাবে ২০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে। 

চাঁদা না দেয়ায় সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার তন্নি হামলা করে জাহিদুল ও তার সহযোগিরা। লোহার রড-হাতড়ি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে টেনে হ্যাচরে রাস্তার পাশে থাকা জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যায় সেখানে গাছের সঙ্গে বেঁধে হামলা চালায় এবং গলায় ওড়না পেচিয়ে বার বার শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করলে তিনি গুরুতর আহত হন। এ সময় সঙ্গে থাকা তার মাকেও লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া জাতীয় দৈনিক অভয়নগর পত্রিকার বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি ও আইপি টেলিভিশন চ্যানেল ২১এর বাগেরহাট প্রতিনিধি হামালার শিকার হোন। নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও তাদের হামলা থেকে রেহায় মেলেনি।

আরও পড়ুন<<>>গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় পুলিশ দম্পতি গ্রেফতার

স্থানীয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে ৪টার সময় মল্লিকের বেড় ইউনিয়নের সন্নাসী বাজার এলাকায় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র বাহিনী লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।  হামলার সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঘরবাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন। এসময় নৌবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফারজানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তাকে লোহার রড-হাতড়ি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে টেনে হ্যাচরে রাস্তার পাশে থাকা জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যায় হয়। সেখানে গাছের সঙ্গে বেঁধে হামলা চালায় এবং গলায় ওড়না পেচিয়ে বার বার শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করলে তিনি গুরুতর আহত হন।

ভুক্তভোগী সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার তন্নি অভিযোগ করে বলেন, আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়েছে। প্রথমে আমাকে মারধর করা হয়। পরে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়েছে এবং লোহার রড় দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিটিয়ে যখম করেছে। হামলার সময় আমার গলার স্বর্ণের চেইন, হাতের থাকা স্বর্ণের ব্যাচলেট, ডায়মন্ডের আংটি ও সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।  

আরেক ভুক্তভোগী জানান, হামলাকারীরা শুধু মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাইকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। কেউ মুখ খুললে তাদেরও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এতে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, আহতদের আর্তচিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এলে হামলাকারীদের ভয়ে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। হামলাকারীরা এতটাই বেপরোয়া ছিলো যে, নৌবাহিনীর কমান্ডার ফারজানা আক্তার এর মা ৭০বছর বয়সি বৃদ্ধাকেও বেদরক মারধর করেছে। তাকে বিবস্ত্র করে স্থানীয়দের সামনে পাকা সড়কের উপড় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়।

পুলিশ আসার সংবাদ পেয়ে হামলাকারীরা ভুক্তভোগীদের ফেলে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। 

হামলার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী সাবেক নৌকর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, সন্ন্যাসী বাজার আমার পৈতৃক বাড়িতে স্থানীয় কয়েকজনকে ভাড়ায় থাকতো। তারা সেখানে স্থানীয়  চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ঘটনাটি জানার পর আমি ভাড়াটিয়াদের নামিয়ে দিতে চাইলেই বিপত্তি বাঁধে। বাড়িতে থেকে মাদক ব্যবসা করা যাবে না বলে যখন প্রতিবাদ করি এবং এ সম্পত্তির উপড় একটি আধুনিক ও উন্নতমানের হাসপাতাল তৈরি করবার ঘোষণা দেই, তখন থেকেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী জাহিদুল বিভিন্নভাবে আমার কাছে ২০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। আমি চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় আমাকে দেখে নেয়া হুমকি দেয়। 

বাগেরহাট সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের স্বজনরা জানান, আহতদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান। চিকিৎসকরা তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।

এ বিষয়ে ফারজানা আক্তার তন্নির ভাই গিটারিষ্ট পরাগ বলেন, এর আগে আমাকে মারা হয়েছে। আজ আমার বোন ও মাকে মারা হয়েছে। সামনেতে ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। তারা আশেপাশের সব দখল করেছে। এখন আমাদের বাড়িও দখল নিতে চায়। তারা আমাদের বাড়ির ওপর স্থানীয় এমপি ও প্রতিমন্ত্রী লায়ন ফরিদ সাহেবের ছবি টাঙ্গিয়ে দিয়েছে। লায়ন ফরিদের লোক জাহিদুল ও তার ভাগিনা বিএনপি সভাপতি সাজু এ কাজগুলো করেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক মানুষের ঘের দখল, দোকানপাট দখলসহ সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি সংক্রান্ত বিরোধে প্রভাব খাটানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলামের জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব সাধারন ঘটনা। এ বিষয়ে কথা বলার মত সময় আমার নেই। আপনারা যা খুশি করতে পারেন। আমি কাউকে পরওয়া করি না।

ঘটনার পর পুরো মল্লিকের বেড় ইউনিয়নে উত্তেজনা ও আতঙ্ক  বিরাজ করছে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এমন ঘটনায় তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার না করা হলে এলাকায় আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু ব্যক্তি আক্রমণ নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রবাহের ওপরও আঘাত। একই সঙ্গে একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনাও অত্যন্ত নিন্দনীয়।

তারা অবিলম্বে হামলার মূল হোতা জাহিদুল ইসলামসহ জড়িত সকল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ জানায়, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উক্ত ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার চিকিৎসা শেষে আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানা গেছে।

আপন দেশ/এসআর

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়