Apan Desh | আপন দেশ

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে সতর্কতা, সামনে বড় ঝুঁকির শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৩:২৫, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৩:২৭, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে সতর্কতা, সামনে বড় ঝুঁকির শঙ্কা

ছবি: আপন দেশ

বর্ষা মৌসুমের সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি, আর সেপ্টেম্বরকে ঘিরে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। এ মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এডিস মশার বিস্তার, জমে থাকা পানি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। প্রতিদিনই বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর চাপও। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ০৩ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৫২ জন। 

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১০১ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার সিটি এলাকার বাইরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

ঢাকা বিভাগে নতুন রোগী পাওয়া গেছে ২২৭ জন। খুলনা বিভাগে ২৪৭ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

আগস্টেই ৯ হাজারের বেশি রোগী : আগস্ট মাস শুরু হওয়ার পর ডেঙ্গুর বিস্তার আরও তীব্র হয়েছে। গত রোববার পর্যন্ত আগস্টের ১৭ দিনেই ৯ হাজার ৫৩৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। জুলাইয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের এবং জুনে ১৩ জনের; অর্থাৎ চলতি বছরের মৃত্যুর বড় অংশই ঘটেছে গত দুই মাসে। ১৬ আগস্টের ২৪ ঘণ্টায় ৮০৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই দিন পর্যন্ত চলতি বছরের মোট রোগী ছিল ২৩ হাজার ৯৭৮ জন এবং মৃতের সংখ্যা ৭০। পরদিনই আরও ৮৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় বোঝা যায়, দৈনিক সংক্রমণের চাপ এখনো কমেনি।

ঢাকার বাইরে বাড়ছে চাপ : ডেঙ্গুকে দীর্ঘদিন মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়ছে। ১৭ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকাগুলোয়, ১৮১ জন। এরপর খুলনা বিভাগে ১৫৩, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৪৬, বরিশালে ১০২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭৭, রাজশাহীতে ৫৭, ময়মনসিংহে ৫১ এবং রংপুরে ১৩ জন ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ড্যাশবোর্ডেও দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের মোট ২৪ হাজার ৮৪৮ রোগীর মধ্যে ১৭ হাজার ৯৬৭ জন সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার, আর সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৫১৫ জন। এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন : ডেঙ্গুতে চলতি বছরে মৃত্যু ১০০ ছাড়াল

চট্টগ্রামেও দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ : ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি অবনতির দিকে। গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামে চলতি বছরে ১ হাজার ১৯৫ সংক্রমণ ও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু আগস্টের প্রথম ১১ দিনেই ৩৬১টি নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো মশার প্রজননস্থলের ঘনত্ব।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি জরিপে নগরের ১৮ ওয়ার্ডে ৩৭০ বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯ বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। পরীক্ষা করা ৩৪৫ পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতেই লার্ভা পাওয়া গেছে। আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানিই এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। ফলে বৃষ্টি যত বাড়ে, কার্যকরভাবে প্রজননস্থল ধ্বংস করতে না পারলে কয়েক সপ্তাহ পর তার প্রতিফলন দেখা যায় রোগীর সংখ্যায়।

বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি : চলতি বছরের ৭১টি মৃত্যুর মধ্যে ২৮ জন পুরুষ এবং ৪৩ জন নারী। বয়সভিত্তিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের মানুষ ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬-৩০ বছর বয়সি মানুষের মধ্যে ১২ জন। এরপর ৪৬-৫০ বছর বয়সি নয়, ৩৬-৪০ বছর বয়সি আট এবং ৩১-৩৫ বছর বয়সি সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশু ও কিশোরেরাও ঝুঁকির বাইরে নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছর ১৫ বছর বা এর কম বয়সি অন্তত নয়জন ডেঙ্গুতে মারা গেছে।

জুলাই-অক্টোবর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ : কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণের সঙ্গে আবহাওয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেন, পরিত্যক্ত টায়ার ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকে। এসব স্থানে এডিস মশা ডিম পাড়ে।

চট্টগ্রামের তথ্যও এই প্রবণতাকে স্পষ্ট করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে জানুয়ারি মাসে ৬৮ সংক্রমণ থেকে জুলাইয়ে সংখ্যা বেড়ে ৫৩৬-এ পৌঁছেছে। জুলাই থেকে অক্টোবর সাধারণত ডেঙ্গুর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।

ফলে আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, সামনে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিএমইউর সচেতনতা সেমিনার : ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ে এক সেমিনারে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) দাবি করেছে, দেশে সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতির পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।

আরও পড়ুন : হাসপাতাল দালালমুক্ত করার ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

মশকনিধনে শুধু ওষুধ ছিটানো কি যথেষ্ট : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। শুধু উড়ন্ত মশা মারতে কীটনাশক ছিটালে সাময়িক ফল পাওয়া যেতে পারে; কিন্তু বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ না করলে নতুন মশার উৎপাদন বন্ধ হবে না।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, চট্টগ্রামের জরিপে বিপুলসংখ্যক পানির পাত্রে লার্ভা পাওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, মশার প্রজননস্থল এখনো বড় সমস্যা। যেহেতু ওই অঞ্চলে কয়েকবার বন্যা হয়েছে, তাই সেখানে এ বছর ডেঙ্গুর বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

তাই দ্রুততম সময়ে ওই এলাকায় জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, বর্জ্য পরিষ্কার, নির্মাণস্থলে নজরদারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড ব্যবহার করতে হবে। না হলে গত বছর যেমন বরিশাল অঞ্চলের পরিস্থিতি হয়েছিল, এ বছর চট্টগ্রামের অবস্থা তেমন হবে।

আগাম শনাক্তকরণে জোর : ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশন যথেষ্ট নয় : ডেঙ্গুর বর্তমান পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে- এটি আর শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়।

স্বাস্থ্য অধিদফরের হিসাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকাতেই চলতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি প্রয়োজন। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, এ লক্ষ্যে মশানিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে। ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে মশা নিধন করলে ডেঙ্গুর বিস্ফোরণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

সামনে আরও কঠিন সময় : ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। ২০২৬ সালের মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো গত দুই বছরের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কিন্তু আগস্টের সংক্রমণের গতি বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। মাত্র ১৭ দিনেই আগস্টে ৯ হাজার ৫৩৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং এক দিনে ৮৭০ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দেখাচ্ছে, ডেঙ্গুর মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি যদি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও অব্যাহত থাকে, তাহলে হাসপাতালগুলোর ওপর কতটা চাপ তৈরি হবে এবং মৃত্যুর সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

এর উত্তর হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো তুলনামূলক ভালো। আমরা বসে নেই। জেলায় জেলায় চিকিৎসার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছি। আমাদের সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এখনই কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি।’

তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, অলরেডি ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ছাদে, সরকারি অফিস, আদালতে মোবাইল কোর্ট ব্যবহার করছি। ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় জরিমানা হয়েছে। অনেক জায়গায় আমরা অব্যাহত রেখেছি এবং এটাকে সচেতনতামূলক করার জন্য আমরা ক্যাম্পেইন করছি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর প্রকোপ পৌঁছাতে পারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এখনই কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিলে অক্টোবরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

আপন দেশ/এমটিআই

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়