Apan Desh | আপন দেশ

ছয় মাসেও গুরুত্বপূর্ণ কমিশন পুনর্গঠনে ব্যর্থ সরকার

শরিফ হোসেন, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১১:৫৫, ১৭ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১১:৫৮, ১৭ আগস্ট ২০২৬

ছয় মাসেও গুরুত্বপূর্ণ কমিশন পুনর্গঠনে ব্যর্থ সরকার

ছবি: আপন দেশ

বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় নানা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পরও এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে না পারায় সরকারের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে দুর্নীতি দমনে কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন।

দুদককে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত, সম্পদের হিসাব যাচাই এবং অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হবে না। এরই মধ্যে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কেউ কেউ আইনের ফাঁকফোকর কিংবা নানা কৌশলে পার পেয়ে যাচ্ছে, এমন অভিযোগও রয়েছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ এবং হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কমিশন কার্যকর না থাকলে নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্ম নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

তথ্য কমিশনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু তথ্য কমিশন কার্যকর ও শক্তিশালী না হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গণমাধ্যম, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে কমিশনের কার্যকর ভূমিকা জরুরি।

অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা, নীতির ধারাবাহিকতা, দুর্নীতির মাত্রা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। বিনিয়োগকারীদের কাছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন ও কার্যকর, সেটিও আস্থার অন্যতম সূচক।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু বিনিয়োগবান্ধব নীতি ঘোষণা করলেই হবে না; একই সঙ্গে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনের শাসন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে নতুন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হতে পারেন।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেও সমান গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন ছিল। কারণ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা কঠিন।

দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার সুরক্ষা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ- এই তিনটি ক্ষেত্রই একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সরকার আগামী দিনগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত পুনর্গঠন করে স্বাধীন ও কার্যকর করতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জনগণ যেমন সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়, তেমনি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররাও দেখতে চান- বাংলাদেশে আইন, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতা কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে।

আরও পড়ুন : প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে বিএনপি সরকারের অগ্রযাত্রা

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আপন দেশ'কে বলেন, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার সুরক্ষা ও তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার উপযোগী করা প্রয়োজন। তা না হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement