ছবি : আপন দেশ
গ্রামে পরিচিতি বেশি, তাই ঝুঁকিও বেশি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে এবার গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী।
দীর্ঘকাল দেশ শাসন করা এ দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাজধানীর জনস্রোতে মিশে গিয়ে নতুন পরিচয়ে বসবাসের চেষ্টা করছেন তাদের কেউ কেউ। কেউ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, কেউ অটোরিকশাচালক, কেউ বিউটি পার্লারে কাজ করছেন। কেউবা মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আবার কারও বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউবের আড়ালে পরিচয় গোপন করে তৎপর থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় সামনে এসেছে আত্মগোপনের এ নতুন চিত্র।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক এলাকা, খিলক্ষেত, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও নিকুঞ্জসহ রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় পলাতক নেতাকর্মীদের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
এর মধ্যে গত ১৩ আগস্ট রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৫৩ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে শোকদিবস পালনের প্রস্তুতি ও ঝটিকা মিছিলের উদ্দেশ্যে তারা সেখানে সমবেত হয়েছিল। একসঙ্গে এত মানুষের একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অবস্থানের ঘটনায় আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্রাম ছাড়ার নেপথ্যে পরিচিতির ঝুঁকি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশ আত্মগোপনে চলে যান। দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশ ছাড়লেও স্থানীয় পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী দেশের ভেতরেই অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক পরিচিতি থাকার কারণে গ্রামে বা জেলা শহরে তাদের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বিপরীতে রাজধানীর লাখো মানুষের ভিড়ে পরিচয় আড়াল করা তুলনামূলক সহজ। ফলে গ্রাম ও মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে নতুন করে বসতি গড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
কেউ আত্মীয়ের বাসায়, কেউ পরিচিত ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে, আবার কেউ ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন। কেউ কেউ ঘন ঘন বাসা পরিবর্তন করছেন বলেও জানা যাচ্ছে।
আবাসিক এলাকাই ‘নিরাপদ আশ্রয়’
রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতে সাধারণত বিভিন্ন জেলা ও শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করেন। ফলে নতুন কোনো ভাড়াটিয়া বা কর্মচারীর রাজনৈতিক পরিচয় স্থানীয়ভাবে সহজে শনাক্ত করা কঠিন। এ সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছেন আত্মগোপনে থাকা অনেকে, এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বসুন্ধরা, উত্তরা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক এলাকা, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও নিকুঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন ব্যক্তিদের অবস্থানের তথ্য রয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
তবে কোনো আবাসিক এলাকার সব বাসিন্দা কিংবা ভাড়াটিয়াকে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা বা সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
এ বিষয়ে ভাটারা থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, ১৫ আগস্ট উপলক্ষে শোক দিবস পালনের প্রস্তুতি সভা করতে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। পরে অভিযান চালিয়ে ৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার উদ্ধার করা হয়েছে।
তারা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিলেন বলেও পুলিশের দাবি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পেশা বদলে নতুন পরিচয়
আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কেউ কেউ পরিচয় গোপন করতে পেশাও বদলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগপন্থী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী হিসেবে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি অটোরিকশা চালানো, বিউটি পার্লার, মোটরসাইকেল ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হওয়ার তথ্যও রয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের কাছে।
কেউ আবার অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কাজে যুক্ত হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকায় এসে সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ
গ্রাম থেকে শহরে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্য শুধু নিরাপদে থাকা নয়, রাজধানীতে থাকা নেতাকর্মীদের একটি অংশ আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট পরিসরে বৈঠক, ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অভিযোগে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। গত ২১ জুন শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে ১৪ জন গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। তাদের মধ্যে মোহাম্মদপুর কলেজ গেট এলাকা থেকে আটজনকে গ্রেফতারের কথা জানায় পুলিশ।
এর আগে বনশ্রী, বেইলি রোড, জুরাইন, ধানমন্ডি ও চকবাজার এলাকাতেও আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের খবর এসেছে।
এ ঘটনাগুলো থেকে অন্তত প্রশ্ন উঠছে, আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ কি কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঢাকায় এসেছেন, নাকি রাজধানী থেকেই সাংগঠনিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন?
উত্তরাতেও আত্মগোপনের সন্ধান
রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায়ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আত্মগোপনের তথ্য বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। উত্তরা, দক্ষিণখান ও তুরাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যা মামলার আসামি আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়। তাদের একজন উত্তরার একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছিল।
ঝটিকা মিছিলের পর উত্তরা থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকে গ্রেফতারের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
রাজধানীর আবাসিক এলাকায় পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্তের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তৎপরতা কতটা কার্যকর, এসব ঘটনা সে প্রশ্নও সামনে এনেছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় স্রোত
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।
বরিশাল বিভাগের ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও পিরোজপুরের কয়েকজন নেতাকর্মীও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ হওয়ায় নিজ এলাকায় থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে, এমন নেতাকর্মীরা রাজধানীর ভিড়ে নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে চাইছেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।
ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের একটি অংশ ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীতে থাকা কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।
যাদের নাম আসছে
সূত্রের পক্ষ থেকে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে জাহাঙ্গীর কবির নানক, গাজীপুরের জাহাঙ্গীর, মাদারীপুরের নিক্সন চৌধুরী, বাহাউদ্দিন নাছিম, নুরুন্নবী শাওন, আড়াইহাজারের নজরুল ইসলাম বাবু, শরীয়তপুরের এনামুল হক শামীম, ভান্ডারিয়ার মহারাজ, পটুয়াখালীর পৌর মেয়র মহিউদ্দিন এবং ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঁচ লাখ লোক নামানোর পরিকল্পনা
আরও একটি গুরুতর দাবি রয়েছে, সুযোগ পেলে একযোগে বিপুলসংখ্যক মানুষকে রাজপথে নামানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। কোনো কোনো সূত্রে পাঁচ লাখ মানুষের জমায়েতের কথা বলা হয়েছে।
তবে এত বড় জমায়েতের বাস্তব প্রস্তুতি বা সাংগঠনিক সক্ষমতার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এটি বাস্তব পরিকল্পনা, নাকি রাজনৈতিক কথাবার্তার অংশ, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শহরে আশ্রয়, শহর থেকেই সংগঠনের চেষ্টা?
সাম্প্রতিক গ্রেফতারের ঘটনাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, রাজধানী এখন শুধু আত্মগোপনের জায়গা নয়, রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া একটি অংশের জন্য যোগাযোগ ও সংগঠিত হওয়ার সম্ভাব্য ক্ষেত্রও হয়ে উঠতে পারে।
বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটে ৫৩ জনের অবস্থান এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকা থেকে ধারাবাহিক গ্রেফতারের ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও সামনে এনেছে।
প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অভিযান
গ্রাম ছেড়ে শহরে নিরাপদ আবাস গড়ার প্রবণতা সত্যিই বেড়েছে কি না, তা জানতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকা মামলার তথ্য, গ্রেফতারি পরোয়ানা, ভাড়াটিয়া নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং সাম্প্রতিক গ্রেফতারের তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী ইজাজুল হক বলেন, রাজধানীতে কোনো ‘চিরুনি অভিযান’ হলে সেটিও হতে হবে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ও আইনি ভিত্তির ওপর। কারণ আত্মগোপনে থাকা মামলার আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতার করা যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব, তেমনি নিরপরাধ নাগরিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে হয়রানি না করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কতজন কেবল আত্মগোপনে আছেন, আর কতজন আবার সংগঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন প্রশ্ন বড় করে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোর দিকে নজর দেয়ার সময় এসেছে।
আপন দেশ/মিম/এনএম
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































