ছবি: আপন দেশ
নারীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয় নিজের ঘর। বাবা, স্বামী কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যে ঘরে নিরাপদে থাকার কথা, সে ঘরই এখন অনেক নারীর জন্য হয়ে উঠেছে সহিংসতার প্রধান স্থান।
পরিসংখ্যানও বলছে, ঘরের বাইরে নয়, বরং ঘরের ভেতরেই নারীরা বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে প্রায় ৪০০ নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন প্রায় ৪৫০ জন।
এ ছাড়া পারিবারিকসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৮০০-এর বেশি নারী ও শিশু। সহিংসতার শিকার হয়ে কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ বাধ্য হচ্ছেন বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে।
নারীর প্রতি সহিংসতার এমন চিত্রের মধ্যে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতে স্বামীর বাসা থেকে মুক্তা ইসলাম মাওয়া নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর দুই দিন আগে একটি ভিডিওতে তাকে খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওতে স্বামীকে ভালোবাসার কথা বলেও নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি তিনি।
এর আগে গত ১৭ মে গাজীপুরে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ পরিবারের চার সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে ফোরকান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ছাড়া শিশু কন্যা রামিসা ও আসিয়াসহ বিভিন্ন বয়সী নারীরও পরিবারের সদস্য, স্বজন কিংবা পরিচিতজনদের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। বেসরকারি চাকরিজীবী সামিয়া রহমান বলেন, মা হিসেবে, নারী হিসেবে, একজন স্ত্রী হিসেবে নারীরা আজও সমাজে অবহেলিত। পরিবারে অনেক নারী তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাচ্ছেন না।
আরেক নারী সানজিদা ইসলাম বলেন, যে বাড়িটা তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই স্বামী বা খুব কাছের মানুষদের হাতে হোম ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের সবার জন্যই আতঙ্কজনক।
ঘরের চেয়ে বাইরে নারীরা বেশি অনিরাপদ—এমন একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের এক জরিপে নারীর প্রতি সহিংসতার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় চার নারীর মধ্যে তিনজনই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নিজ ঘরে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, নারীর নিরাপত্তাহীনতা এখন শুধু ঘরকেন্দ্রিক নয়; কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন ও জনসমাগমের স্থানেও নারীরা নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
নারী অধিকারকর্মী ডা. ফৌজিয়া মুসলিম বলেন, ঘরে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায়, বাসে, বাজারে—কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই। আইনের দুর্বলতার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। আইন যতটুকু আছে, সেগুলো যথেষ্ট প্রগতিশীল।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব মামলার বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। বিচারকস্বল্পতা, আদালতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতায় অনেক মামলার নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে এবং অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে আইনের ফাঁক গলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, মূল থেকে সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে, উপজেলা পর্যায়ে আদালতের কার্যক্রম নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় যে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোও ঠিক করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নারী সহিংসতা কমাতে শুধু নতুন আইন করলেই হবে না, বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ থেকে তদন্ত ও বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোকে ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে এড়িয়ে না গিয়ে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
নারীর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ঘরকে ফিরিয়ে আনতে হলে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
আপনদেশ/কেএম/এমটিআই
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































