Apan Desh | আপন দেশ

এক মাসে হাম উপসর্গে ১৯৮ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২১:৩৮, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

এক মাসে হাম উপসর্গে ১৯৮ শিশুর মৃত্যু

ছবি : সংগৃহীত

বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিনই হাম ও সন্দেহজনক হামে শিশু মৃত্যুর খবর আসছে । যা উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত এক মাসে প্রায় ২০০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরকার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও তা এখনও সীমিত পরিসরে থাকায় অনেক শিশু রয়ে গেছে ঝুঁকির মধ্যে। এ অবস্থায় দ্রুত ও জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে নিশ্চিত হাম ও সন্দেহজনক উপসর্গ মিলিয়ে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক ১৬৬ জন এবং নিশ্চিত হামে ৩২ জন মারা গেছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

জেলাভিত্তিক হিসাবে গত একমাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকায় ৯৪ জন। রাজশাহীতে ৬৮ জন এবং চট্টগ্রামে ১৫ জন মারা গেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার সারাদেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের আওতায় আনতে চালু করা হয়েছে ‘ক্যাচ-আপ’ কার্যক্রম। পাশাপাশি ইপিআই কার্যক্রম শক্তিশালী করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে র‌্যাপিড রেসপন্স টিম সক্রিয় রাখা এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

প্রথম ধাপে ১৮টি জেলা ও ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে। এর আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের দ্রুত টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। 

আরও পড়ুন<<>>টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে স্পিকারের বিস্ফোরক মন্তব্য

গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ‘হাম-রুবেলা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি’র আওতায় ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত আট দিনে ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪০ শিশু টিকা পেয়েছে। যেসব এলাকায় এখনও কর্মসূচি শুরু হয়নি, সেখানে ২০ এপ্রিল থেকে টিকা দেয়া শুরু হবে।

এছাড়া হাসপাতালগুলোতে হাম রোগীদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় রাখা হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও কমিউনিটি পর্যায়েও প্রচার চলছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, টিকাদানের ঘাটতি ও বড় পরিসরের নিয়মিত ক্যাম্পেইন না হওয়ায় হামের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকার দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের আওতায় আনতে কাজ করছে। লক্ষ্য অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে শয্যা, ভেন্টিলেটর ও জনবল প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা দেয়া যায়। গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে টিকা নেয়া এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার আহবানও জানান তিনি।

এদিকে, সংসদে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টিকাদান কার্যক্রমে অতীতের গাফিলতির কথা উল্লেখ করায় দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক মাসে প্রায় ২০০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, একসময় দেশে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় এটি আবার বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে ৯৭–৯৮ শতাংশ শিশু টিকা পেত, এখন তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ ভেঙে গিয়ে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

তিনি জানান, হাম খুব সহজে ছড়ায়—হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে, সংস্পর্শে আসা হাতের মাধ্যমে এবং ব্যবহার্য জিনিস ভাগাভাগি করলে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, শিশুকে দুই ধাপে হামের টিকা দেয়া হয়। ৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ। দ্বিতীয় ডোজ না নিলে পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে এমআর টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছে ৯১ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৮৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ শিশু। পরবর্তী বছরগুলোতে কাভারেজ কিছুটা কমে যায়। ২০২৫ সালে তা নেমে দাঁড়ায় প্রথম ডোজ ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশে। ফলে কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু পূর্ণ টিকার বাইরে থেকে গেছে।

এছাড়া চার বছর পরপর হওয়া ‘এমআর ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি করোনা মহামারির কারণে ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালেও তা আয়োজন না হওয়ায় প্রায় ৫–৬ বছরের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।

আপন দেশ/এসআর

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়