ছবি: আপন দেশ
রাণী ভবাণী, বাংলার ইতিহাসে এক মহীয়সী নারী। স্মৃতিবিজড়িত বগুড়া জেলার আদমদীঘির ছাতিয়ানগ্রামে তার জন্ম। তবে তার জন্মস্থান জমিদার বাড়ি এখন শুধুই কালের সাক্ষী। ভঙ্গুর, কঙ্কালসার ধ্বংসাবশেষ অতীতের শেষ চিহ্ন হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ঢেকে গেছে ঝোপ-জঙ্গলে। সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে জমিদার বাড়িটির হারিয়েছে তার জৌলুস। দখল হচ্ছে জমিদার বাড়িসহ আশপাশের জমি। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে জন্মভিটাটি সংরক্ষণ করা হোক।
ছাতিয়ান গ্রামের হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে রাণী ভবানীর বাবার বাড়ি। সেখানে কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে এসব স্থাপনা। সময়ের সঙ্গে ভেঙে পড়ছে পুরোনো ভবনের অংশবিশেষ। আগাছা আর ঝোপ-জঙ্গলে অনেক জায়গা ঢেকে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাণী ভবানীর জন্মস্থান দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন। কিন্তু এখানে এসে তারা হতাশ হন। ঐতিহাসিক স্থানটির কোনো সুষ্ঠু সংরক্ষণ নেই। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এর ঐতিহ্য।
ইতিহাস অনুযায়ী, রাণী ভবানী ১৭১৬ সালে বগুড়া জেলার আদমদীঘির ছাতিয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন এক জমিদার। নাম তার আত্মারাম চৌধুরী। স্ত্রীর নাম তমাদেবী চৌধুরী রাণী। তারা ছিলেন নিঃসন্তান। সন্তান লাভের আশায় আত্মারাম চৌধুরী বাড়ির কাছে একটি নির্জন পুকুরপাড়ে সাধনা শুরু করেন। সে স্থানটি বর্তমানে সিদ্ধেশ্বরী নামে পরিচিত। পরে আত্মারাম চৌধুরীর ঘরে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। তার নাম রাখা হয় ভবানী।
নাটোরের রাজকুমার রামকান্তের সঙ্গে ভবানী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোন। বিয়েতে ভবানী কয়েকটি শর্ত দেন-বলে স্থানীয় ইতিহাসে প্রচলিত আছে। এর মধ্যে ছিল ছাতিয়ানগ্রামে ৩৬৫টি পুকুর খনন, ছাতিয়ানগ্রাম থেকে নাটোর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ এবং এলাকার প্রজাদের ভূমি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা।
স্থানীয়দের দাবি, সে সময় পানির সংকট দূর করতে ছাতিয়ানগ্রামে ৩৬৫টি পুকুর খনন করা হয়। এসব পুকুরের বেশ কটির চিহ্ন এখনো রয়েছে। ছাতিয়ানগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বদিকে ভবানীর জাঙ্গাল নামে একটি রাস্তার স্মৃতিও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। বিয়ের পর ভবানীর মা জয়দুর্গা দেবী মারা যান। মায়ের স্মৃতি ধরে রাখতে ভবানী তার জন্মস্থানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। মন্দিরটির নাম ছিল জয়দুর্গা মন্দির।
আরও পড়ুন<<>>পাট পাচার বন্ধের দাবিতে কুড়িগ্রামে মানববন্ধন
১৭৪৮ সালে স্বামী রাজকুমার রামকান্তের মৃত্যুর পর রাণী ভবানী নাটোরের জমিদারির দায়িত্ব নেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি জমিদারি পরিচালনা করেন। জনকল্যাণমূলক নানা কাজের জন্য তিনি ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। অসংখ্য পুকুর খনন, হাট-বাজার স্থাপন, মসজিদ-মন্দির নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন এ মহীয়সী নারী। তার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থাপনা এখনো আদমদীঘি ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে আছে।
দান-ধ্যান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং জনকল্যাণমূলক নানা কাজের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। প্রজাদের কল্যাণে তার নানা উদ্যোগের কারণে তিনি মহারাণী হিসেবে পরিচিতি পান।
ছাতিয়ান গ্রামের সমাজসেবক আলী রাজ হোসেন বলেন, রাণী ভবানী শিশুকাল থেকেই ধর্মপরায়ণ ও মানবকল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। ৩৬৫টি পুকুর ও রাস্তা তিনি শুধু নিজের জন্য করেননি। এগুলো ছিল সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য।
তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগে জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা হলে এটি ধ্বংস ও দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক এ এলাকার পরিবেশও বদলে যাবে।
ছাতিয়ানগ্রামের বাসিন্দা সরকারি চাকরিজীবী আজিমুদ্দিন এলাহী বলেন, ছেলেবেলা থেকেই রাণী ভবানীর রাজবাড়ি ও মন্দির ঝোপ-জঙ্গলে পড়ে থাকতে দেখছি। এখন তার পিতৃগৃহের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া তেমন কিছু নেই।
তিনি বলেন, রাণী ভবানীর মায়ের স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত জয়দুর্গা মন্দির ও শিবমন্দিরও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এসব স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এটি বগুড়ার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি উদ্যোগে রাণী ভবানীর জন্মভিটা সংস্কার ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
রাণী ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত স্থান দেখতে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরের সহকারী শিক্ষক প্রাণ গোপাল দাস বিপ্লব পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে সেখানে যান। জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
এব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন তালুকদার বলেন, সরকারি উদ্যোগে জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা হলে এটি ধ্বংস ও দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে রানি ভবানীর জন্মভূমির ঐতিহাসিক নিদর্শনও টিকে থাকবে।
আদমদীঘির ইউএনও মাসুমা বেগম বলেন, রাণী ভবানীর জন্মস্থান সংস্কার বা সংরক্ষণের দাবিতে গণশুনানির বিষয়টি তার জানা নেই। তবে স্থানটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কাছে চিঠি দেয়া হবে।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































