Apan Desh | আপন দেশ

ট্রাম্পের ক্ষমতা কতটুকু কমল

আান্তর্জাতিক ডেস্ক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৮, ৫ নভেম্বর ২০২৬

ট্রাম্পের ক্ষমতা কতটুকু কমল

ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা কিছু আসনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় তুলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসে উভয়কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিরোধীরা। 

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এমন ভরাডুবির পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ফলাফল মেনে নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। আবার লড়াই চালিয়ে যাবারও ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নিজের মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ব্যালেটে তিনি ছিলেন না, তিনি থাকলে রিপাবলিকানরা ভূমিধস জয় পেত!

পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘ফলাফল মেনে নিতে পুরোপুরি আগ্রহী’ এবং ‘ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ’ করতে চান। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একটি লাল রঙের ‘মাগা’ টুপির ছবি পোস্ট করেন। সেখানে তার নির্বাচনী স্লোগানের পরিবর্তে লেখা ছিল ‘ভেটো’। এর মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো আইন আটকে দেয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা তথা প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতার কথা ইঙ্গিত করেন।

কিন্তু সমালোচক এবং ধারাভাষ্যকাররা এরইমধ্যে বলে বসছেন, কংগ্রেসের উভয়কক্ষ রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হওয়ায় ট্রাম্প এখন ‘ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট’-এ পরিণত হয়েছেন।

ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট মানে কী?

প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে লেম ডাক বা ‘ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট’ বলতে তার মেয়াদের শেষ পর্যায়কে বোঝায়। সাধারণত তার উত্তরসূরি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত সময়কে এ নামে অভিহিত করা হয়। মেয়াদের বাকি সময় সীমিত থাকায় বিদায় নিতে যাওয়া কোনো রাজনীতিকের প্রভাব ও ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে মনে করা হয়।

তবে এখানে এই শব্দটি আরও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো রাজনীতিকের নির্ধারিত বা প্রত্যাশিত বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসার ফলে নীতিনির্ধারণে তার প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা কমে গেলে, দীর্ঘ সময়কেও এখন ‘লেম ডাক’ বা ক্ষমতা হারানোর পর্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বে থাকা এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের কর্মসূচির ওপর প্রেসিডেন্টের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কিন্তু এখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কংগ্রেসের উভয়কক্ষের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে। ফলে আইন প্রণয়নের এজেন্ডার ওপর তার প্রভাব অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বিরোধিতার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের উদ্বেগও কমতে পারে। কারণ, তার ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব ছাড়তেই হবে—যদি না ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কোনো উপায় খুঁজে বের করেন।

এছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে ব্যাপকভাবে ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তার ক্ষমতা ছাড়ার তারিখও নির্ধারিত—জানুয়ারি ২০২৯। এসব কারণে নিজের নীতির পক্ষে সমর্থন আদায় করতে দলের সহকর্মী রিপাবলিকানদের রাজি করানো কিংবা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের সক্ষমতাও তার কমে যেতে পারে।

এসব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দ্বিতীয় মেয়াদের এখনও দুই বছর বাকি থাকলেও ট্রাম্প ইতিমধ্যেই তার প্রেসিডেন্ট পদের ‘ক্ষমতা হারানোর পর্যায়ে’ প্রবেশ করছেন।

যদিও ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টদের প্রায়ই দুর্বল বা অকার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ইতিহাস বলছে, নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তারা মোটেও ক্ষমতাহীন নন।

ট্রাম্পের হাতে এখনও কী কী ক্ষমতা রয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিভক্ত সরকারব্যবস্থার একটি পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার শক্তিশালী প্রভাব কমে গেলেও নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে তার হাতে এখনও বেশ কিছু ক্ষমতা রয়েছে।

অতীতে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ থাকা অবস্থাতেও আইন প্রণয়নের অচলাবস্থা এড়াতে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি হোয়াইট হাউসের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য কংগ্রেস ট্রাম্পের চাওয়া অর্থের মাত্র একটি অংশ বরাদ্দ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে নির্বাহী আদেশ জারি করে সীমান্তপ্রাচীর নির্মাণের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অন্য খাতে বরাদ্দ করা অর্থ থেকে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেন।

কোনো প্রেসিডেন্ট জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে কংগ্রেস একটি যৌথ প্রস্তাব পাস করে সেই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট তখন তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই প্রস্তাব আটকে দিতে পারেন।

প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয়কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এককভাবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না।

প্রেসিডেন্ট তার ভেটো ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটদের আনা সব ‘উন্মাদ’ আইনপ্রণয়ন প্রস্তাবে তিনি ভেটো দেবেন।

তিনি আরও বলেন, আর কয়েক মাস ভেটো দেয়ার পর তারা বাইরে যাবে এবং বলবে, ‘কীভাবে আমরা এসব কাজ সম্পন্ন করব?’ এরপর আমরা একসঙ্গে কাজ করব।

আরও পড়ুন <> মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৩ জনের জয়

অন্য ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টরাও কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পেরেছেন?

ইতিহাসে দেখা গেছে, ‘লেম ডাক’ বা ক্ষমতা হারানোর পর্যায়ে থাকা প্রেসিডেন্টরাও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন। তবে তারা সাধারণত এমন ক্ষেত্রগুলোতে বেশি মনোযোগ দেন, যেখানে নির্বাহী বিভাগের ব্যাপক স্বতন্ত্র ক্ষমতা রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষক জেমস বয়েজ আলজাজিরাকে বলেন, রিপাবলিকান পার্টির জন্য ‘নেতিবাচক’ নির্বাচনী ফলাফল সত্ত্বেও অনেক বিষয় এখনও কংগ্রেসের আওতার বাইরে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দেশটির প্রেসিডেন্টকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। তাই ধারণা করা যায়, ট্রাম্প তার ক্ষমতায় থাকার বাকি সময়ের বড় একটি অংশ এই ক্ষেত্রেই ব্যয় করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ঠিক এমন পথই বেছে নিয়েছেন।

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত করেন। এ চুক্তি জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামেও পরিচিত। একই সময়ে তিনি কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন।

‘লেম ডাক’ সময়কালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার বিতর্কিত স্বাস্থ্যসেবা আইন ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ (এসিএ) রক্ষা করতেও সক্ষম হয়েছিলেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার ক্ষমতার শেষ কয়েক মাস পররাষ্ট্রনীতিতে মনোযোগ দেন। ২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনের আয়োজন করে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেঙে যায়।

এছাড়া তিনি তার নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ৫ কোটি ৮৫ লাখ একর বনভূমি সংরক্ষণ, নির্ধারিত ফেডারেল ভূমিতে বৃহৎ পরিসরে খনন ও গাছ কাটার কার্যক্রম সীমিত করা এবং পানির উৎসসমূহের সম্পদ সংরক্ষণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দেয়ার পর ‘লেম ডাক’ সময়ে প্রবেশ করেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার শেষ দিনগুলোতে বাইডেন ছেলে হান্টার বাইডেনকে ব্যাপক পরিসরে ক্ষমা ঘোষণা করেন। পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্য ও কর্মীদের জন্যও আগাম ক্ষমার ব্যবস্থা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের নীতির বিপরীতে গিয়ে বাইডেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার আরও গভীরে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেন।

এছাড়া নবনির্বাচিত ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ৬১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজটি বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে তিনি প্রতিরক্ষা দফতরকে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দকৃত অবশিষ্ট অর্থ সহায়তা দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন।

আপন দেশ/এমটিআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়