ছবি: আপন দেশ
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে রাজশাহীতে উৎসবের আমেজ, নগরজুড়ে সাজসজ্জা আর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। তবে এই আয়োজনের বাইরেও উত্তরাঞ্চলের মানুষের মনে বড় হয়ে উঠেছে উন্নয়নের প্রত্যাশা।
বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন—দীর্ঘদিনের এসব দাবি এবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরতে চান রাজশাহীবাসী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো রাজশাহী সফরে আসছেন তারেক রহমান। তার এ সফরকে ঘিরে সম্ভাবনার নতুন হিসাব কষছেন স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা।
সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর দেড়টায় রাজশাহী ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি। পরে বিকেল ৩টায় নগরীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিকে ঘিরে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সফর থেকে রাজশাহীর উন্নয়নে কার্যকর ঘোষণা আসবে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
গত জানুয়ারিতে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিতে রাজশাহীতে এসেছিলেন তারেক রহমান। প্রায় সাড়ে আট মাস পর আবারও তাঁর আগমন ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। তবে এবার রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে নয়, সরকারপ্রধান হিসেবে রাজশাহীতে আসছেন তিনি।
ফলে জনসভায় রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী হবে, সেদিকেও নজর থাকবে মানুষের।
রাজশাহী কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।
কৃষি উৎপাদন বাড়লেও স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প স্থাপন, পণ্য সংরক্ষণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের।
এ ছাড়া বন্ধ ও সংকটাপন্ন চিনিকলগুলোর কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, আখচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি উঠছে।
পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, নগরীর যানজট নিরসন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, রাজশাহীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ ও পর্যটনকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, রাজশাহীর মানুষের প্রত্যাশা অনেক। এ অঞ্চলের কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাজশাহীর সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে রাজশাহী আরও এগিয়ে যাবে।
রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন বলেন, রাজশাহীর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে রাজশাহীর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন <> খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছে সরকার
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে বিশেষ আলোচনায় রয়েছে চিনিশিল্পের সংকট ও আখচাষিদের ভবিষ্যৎ। একসময় আখ চাষ এবং চিনিকলকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের বহু কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু চিনিশিল্পের সংকট, উৎপাদনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আখচাষে লাভের অনিশ্চয়তা সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ অবস্থায় আখচাষিদের জন্য প্রণোদনা দেয়ার সম্ভাব্য উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, চিনিকলের আধুনিকায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। এতে আখ চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সোমবার দুপুরে জনসভাস্থল পরিদর্শন শেষে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সম্ভাব্য উদ্যোগের কথা তুলে ধরে জানান, আখচাষিদের প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সাজসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনসভা আয়োজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে রাজশাহীবাসীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ রয়েছে। তাঁর সফর সফল করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
রাজশাহীর উন্নয়ন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং নগরীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। জনসভাস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। জেলা প্রশাসন ও মহানগর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সফরের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বয় করছে।
রাজশাহীর মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রত্যাশা সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে শিল্পের সংযোগ তৈরি, চিনিশিল্পের সংকট মোকাবিলা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চান তাঁরা।
গুরুত্বের বাইরে এখন বড় প্রশ্ন, রাজশাহীর উন্নয়নে কী ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর যেন আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সময়োপযোগী পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচির সূচনা হয়। তাহলেই রাজশাহীর উন্নয়ন প্রত্যাশা বাস্তব অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
আপন দেশ/এমটিআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































